ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যবাদ’ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন রণক্ষেত্র: হোয়াইট হাউসের পররাষ্ট্রনীতি কি এখন বিক্রয়যোগ্য পণ্য?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্ব এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের ওপর মার্কিন সামরিক হামলা এই অঞ্চলকে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে । আল জাজিরার বিশেষ অনুষ্ঠান ‘রিফ্রেম’-এ বিশিষ্ট অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেরেমি স্ক্যাহিল এবং প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের নেত্রী বর্ষা গান্ধীকোটা-নালুতলা বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন । তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আধুনিক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এখন আর কেবল ভূ-রাজনীতি নয়, বরং এটি একটি ‘ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক মডেলে’ পরিণত হয়েছে ।
১. ট্রাম্প ২.০: নিওকন এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের মিশেল জেরেমি স্ক্যাহিলের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি অন্তহীন যুদ্ধ (Forever Wars) শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন । কিন্তু ২০২৬ সালের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইরানের ওপর বেপরোয়া হামলা প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প এখন চরমপন্থী ‘নিও-কনজারভেটিভ’ (Neoconservative) গোষ্ঠীর হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন । স্ক্যাহিল যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ট্রাম্প নিজে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট আদর্শে বিশ্বাসী নন, কিন্তু তার চারপাশে থাকা ব্যক্তিদের—যেমন তার জামাতা জ্যারেড কুশনার—ব্যবসায়িক স্বার্থ এই যুদ্ধগুলোকে উস্কে দিচ্ছে ।
বিশেষ করে ইসরায়েলি লবিস্ট মিরিয়াম অ্যাডেলসন ট্রাম্পের প্রধান দাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যাকে স্ক্যাহিল ‘পররাষ্ট্রনীতি ক্রয়ের’ একটি উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন । অভিযোগ উঠেছে যে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এখন ইসরায়েলের স্বার্থ এবং কুশনারের রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টের সুবিধার জন্য পরিচালিত হচ্ছে ।
২. ইরানের ওপর হামলা ও কূটনীতির ব্যর্থতা ২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরান আক্রমণ করার আগে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। স্ক্যাহিল জানিয়েছেন যে, ইরানের আলোচকরা যুদ্ধের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন । তারা ট্রাম্পের ‘ব্যবসায়ী সত্তা’কে তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন যাতে পরমাণু সমঝোতা (JCPOA) সফল হয় । কিন্তু মার্কিন ও ইসরায়েলি পক্ষ আলোচনার ভান করে হঠাৎ করে ইরানের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে, যাকে স্ক্যাহিল একটি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এই হামলার পর ইরানও দমে থাকেনি। তারা ওমান, কুয়েত, কাতার এবং সৌদি আরবের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়েছে । ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই পাল্টা হামলার সময় হওয়া ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বা সাধারণ মানুষের ক্ষতির জন্য ক্ষমা চাইলেও স্পষ্ট করেছেন যে, আমেরিকা ও ইসরায়েলই এই যুদ্ধের উস্কানিদাতা ।
৩. ‘এপস্টাইন রেজিম’ ও মার্কিন এলিটদের আইনহীনতা ইরান বর্তমানে মার্কিন সরকারকে ‘এপস্টাইন রেজিম’ (Epstein Regime) বলে সম্বোধন শুরু করেছে। জেরেমি স্ক্যাহিলের মতে, জেফরি এপস্টাইনের কেলেঙ্কারি কেবল ব্যক্তিগত যৌন অপরাধের বিষয় নয়, বরং এটি মার্কিন এলিট শ্রেণীর পচন এবং আইনহীনতার প্রতীক । তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যখন এই এলিটদের একে অপরের সাথে ষড়যন্ত্র করতে দেখে, তখন তাদের আর অবাক হওয়ার কিছু থাকে না । এই এলিট গোষ্ঠীটি দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদ চুরি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, যা এখন একদম প্রকাশ্যে চলে এসেছে ।
৪. ‘বোর্ড অফ পিস’ এবং জাতিসংঘের নৈতিক পতন বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় কেলেঙ্কারি হলো ‘বোর্ড অফ পিস’ (Board of Peace) নামে একটি ব্যক্তিগত সংগঠনের উত্থান, যাকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বৈধতা দিয়েছে [৯]। এই বোর্ডটির প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং এখানে জ্যারেড কুশনার গাজা উপত্যকায় রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট তৈরির পরিকল্পনা পেশ করেছেন [৯]। স্ক্যাহিল একে ‘হাজার হাজার ফিলিস্তিনির লাশের ওপর আবাসন নির্মাণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন [৯]। তিনি অভিযোগ করেন যে, জাতিসংঘ এখন তার নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব ত্যাগ করে একটি প্রাইভেট ফোর্সের হাতে বিশ্ব শাসন তুলে দিয়েছে ।
৫. ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রজেক্ট ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ ইসরায়েলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এখন প্রকাশ্যে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ (Greater Israel) বা বিশাল ইসরায়েল রাষ্ট্রের কথা বলছেন । তাদের মতে, ইসরায়েলের সীমানা ভূমধ্যসাগর থেকে শুরু করে দজলা ও ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত । এটি কোনো অলঙ্কারিক কথা নয়, বরং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সার্বভৌম আরব রাষ্ট্রগুলোর জমি দখলের একটি নগ্ন প্রচেষ্টা ।
৬. সাংবাদিকতার ওপর নজিরবিহীন দমন স্ক্যাহিল আক্ষেপ করে বলেন যে, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা করা এখন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে । তিনি যখন হামাস, ইসলামি জিহাদ বা ইরানি কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নেন, তখন হোয়াইট হাউস থেকে তাকে ‘আমেরিকা লাস্ট’ বা দেশের শত্রু হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় । স্ক্যাহিল যুক্তি দেন যে, কোনো পক্ষকে সমর্থন করার জন্য নয়, বরং সত্য জানার জন্য অন্য পক্ষের কথা শোনা জরুরি, যা এখন অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে ।
৭. অতীত থেকে বর্তমান: ওবামা ও বাইডেনের দায় জেরেমি স্ক্যাহিল মনে করেন, ট্রাম্পের এই আইনহীনতার পথটি তৈরি করে দিয়েছেন পূর্ববর্তী ‘ভদ্র’ রাজনীতিবিদরা । ওবামা প্রশাসন যখন বুশ আমলের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করে ‘সামনে তাকানোর’ কথা বলেছিল, তখনই বর্তমানের গাজা গণহত্যা বা ইরানের ওপর হামলার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল । ওবামা সিআইএ-র অপরাধগুলোকে বৈধতা দিয়েছিলেন, যা আজ ট্রাম্পকে যেকোনো বিশ্বনেতাকে অপহরণ বা হত্যা করার সাহস যোগাচ্ছে ।
উপসংহার: সাম্রাজ্যবাদী দম্ভ ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা জেরেমি স্ক্যাহিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘ইম্পেরিয়াল হুব্রিস’ বা সাম্রাজ্যবাদী অহংকারে মত্ত । আফগানিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো ইরানও একটি দীর্ঘ যুদ্ধের পথ বেছে নিতে পারে, কারণ তাদের হাতে সময় আছে, আর আমেরিকার হাতে আছে কেবল ঘড়ি । তবে তিনি এও মনে করেন যে, যখন বিশ্বের শোষিত মানুষ এবং শ্রমিক শ্রেণী একত্রিত হবে, তখন ইতিহাস পরিবর্তনের ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকবে । ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামই এর বড় প্রমাণ যে, নিচ থেকে লড়াই করে সাম্রাজ্যবাদকে রুখে দেওয়া সম্ভব ।
প্রতিবেদন: আল জাজিরা রিফ্রেম-এর বিশেষ আলোচনার ভিত্তিতে।
