তিন দশক পর ইতিহাস: ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন সরাসরি বৈঠক শুরু, মধ্যস্থতায় মার্কো রুবিও
ওয়াশিংটন ডিসি: দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা কূটনৈতিক অচলায়তন ভেঙে অবশেষে সরাসরি আলোচনায় বসেছে ইসরায়েল ও লেবানন । ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করছে মার্কিন প্রশাসন । উল্লেখ্য যে, এর আগে সর্বশেষ ১৯৯৩ সালে এই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি এ ধরণের যোগাযোগ হয়েছিল ।
১. আলোচনার লক্ষ্য ও পাল্টাপাল্টি দাবি: আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বৈঠকের পেছনে দুই দেশের উদ্দেশ্য ভিন্ন । লেবানন কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য হলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ বিমান হামলা বন্ধ করা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা । অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রধান দাবি হলো হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ (Disarmament) । ইসরায়েলের মতে, হিজবুল্লাহর সশস্ত্র উপস্থিতি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাদের সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় ।
২. মার্কো রুবিওর কঠোর অবস্থান: বৈঠক শুরুর প্রাক্কালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি অনন্য মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন । তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, এটি কেবল একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা নয়, বরং এটি এই অঞ্চলে হিজবুল্লাহর ২০-৩০ বছরের প্রভাবের স্থায়ী অবসান ঘটানোর একটি প্রক্রিয়া । রুবিও দাবি করেন যে, লেবাননের সাধারণ মানুষ হিজবুল্লাহ এবং ইরানি আগ্রাসনের শিকার । তার মতে, এই আলোচনা লেবাননের জনগণের জন্য এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে যা তাদের প্রাপ্য এবং ইসরায়েলিরা নির্ভয়ে বসবাস করতে পারবে ।
৩. প্রস্তুতিমূলক পর্যায় ও রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের যোগাযোগ: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে যে, এই আলোচনা বর্তমানে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে (Ambassadorial Level) অনুষ্ঠিত হচ্ছে । গত শুক্রবার দুই দেশের রাষ্ট্রদূতরা প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেন, যা এই সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করে । কর্মকর্তারা এই পর্যায়টিকে ‘প্রস্তুতিমূলক’ (Preparatory) হিসেবে বর্ণনা করেছেন । মার্কো রুবিও স্বীকার করেছেন যে, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই জটিলতাগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৈঠকে সমাধান হবে না, বরং এটি একটি দীর্ঘ ও অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র ।
৪. ইরান-আমেরিকা আলোচনা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল: এই বৈঠকের একটি কৌশলগত দিক হলো এটিকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার বৃহত্তর আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা । মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং লেবানন সরকার—উভয় পক্ষই এই বিষয়ে একমত যে, ইসরায়েল-লেবানন ইস্যুটিকে যেন ইরান-আমেরিকা দর কষাকষির অংশ করা না হয় । লেবাননের আশঙ্কা, যদি এই আলোচনা ইরানের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তবে ইরান লেবানন সরকারের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক চাপ বা ‘লেভারেজ’ তৈরির সুযোগ পাবে ।
৫. ভবিষ্যতের রূপরেখা: যদিও এই সরাসরি আলোচনাকে একটি বিশাল ‘ব্রেক-থ্রু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তবুও এর সফলতা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে । একদিকে ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণের দাবি এবং অন্যদিকে লেবাননের যুদ্ধ থামানোর আকুতি—এই দুইয়ের মাঝে একটি স্থায়ী কাঠামো বা ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করাই এখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান চ্যালেঞ্জ ।
পরিশেষে বলা যায়, তিন দশক পর ওয়াশিংটনের এই সরাসরি বৈঠক মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে হিজবুল্লাহর প্রভাব কমিয়ে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি স্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে ।
