যুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাতযুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত

যুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত

যুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত: সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন সচল, চরম সংকটে কুয়েত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আমেরিকা, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যকার বিধ্বংসী যুদ্ধের পর ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগে নিজেদের তেল ও জ্বালানি নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনে কোমর বেঁধে নেমেছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় সাফল্য পেয়েছে সৌদি আরব। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত তাদের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইনটি এখন পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরেছে ।

যুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত
যুদ্ধবিরতির মাঝে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি খাত

সৌদি আরবের কৌশলগত বিজয় ও বিকল্প পথ: সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, দীর্ঘ মেরামতের পর ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি এখন প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ (৭ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল পাম্প করতে সক্ষম । এই পাইপলাইনটি সৌদি আরবের জন্য একটি বিশাল শক্তির উৎস, কারণ এটি হোরমুজ প্রণালীকে এড়িয়ে সরাসরি লোহিত সাগরের ইয়ামু (Yanbu) পোর্টে তেল পৌঁছে দেয় ।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যখন হোরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দেয় বা সেখানে হামলা চালায়, তখন সৌদি আরব এই বিকল্প পথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখতে পারে । কয়েকদিন আগেও এই পাইপলাইনটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল, যা এখন পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে [১]। এছাড়া মানিফা (Manifa) তেলক্ষেত্রেও উৎপাদন শুরু হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল তেল পুনরায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে খুরাইস (Khurais) তেলক্ষেত্রের কাজ এখনো চলমান রয়েছে।

কুয়েতের তেল উৎপাদনে ধস: সৌদি আরব বিকল্প পথ ব্যবহারের সুযোগ পেলেও প্রতিবেশী দেশ কুয়েতের পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুয়েতের তেল রপ্তানির একমাত্র পথ হলো হোরমুজ প্রণালী । যুদ্ধের প্রভাবে এবং ইরানি হামলার কারণে কুয়েতের তেল উৎপাদন প্রতিদিন ৩০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ৫ লাখ ব্যারেলে এসে ঠেকেছে । কোনো বিকল্প পথ না থাকায় কুয়েতের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে এবং দেশটি দ্রুত হোরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে তদ্বির করছে ।
ইসলামাবাদ বৈঠক পরবর্তী কূটনৈতিক তৎপরতা: ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে । জেডি ভ্যান্সের দেওয়া ‘রেড লাইন’ বা শর্তগুলো ইরান মেনে না নেওয়ায় আলোচনা ভেস্তে গেলেও, উপসাগরীয় দেশগুলো হাল ছাড়তে নারাজ ।

কুয়েত সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মালিক ট্রিনার জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন একযোগে একটি ‘ডিপ্লোমেটিক ফ্লাারি’ বা ব্যাপক কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে । তাদের স্পষ্ট বক্তব্য হলো—এই সংকটের কোনো সামরিক সমাধান নেই, একমাত্র কূটনীতিই দীর্ঘমেয়াদী শান্তির পথ । তারা আমেরিকা ও ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে যাতে একটি ‘সমন্বিত চুক্তি’ (Comprehensive Deal) সম্পন্ন হয় ।

ইসরাইলি নাশকতার আশঙ্কা ও লেবানন ইস্যু: উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি বড় ভয় কাজ করছে যে, ইসরাইল হয়তো এই শান্তি আলোচনা বা চুক্তিকে নস্যাৎ (Sabotage) করার চেষ্টা করতে পারে । বিশেষ করে লেবানন পরিস্থিতি এবং হোরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যদি হোরমুজ প্রণালী স্থায়ীভাবে খুলে দেওয়া না হয়, তবে এই অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই সৌদি আরব ও তার সহযোগীরা চাইছে লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের জন্য একটি স্থায়ী সমাধান, যেখানে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ থাকবে না ।
রণক্ষেত্রের প্রভাব ও জ্বালানি নিরাপত্তা: আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে জানা গেছে যে, ইরানের ‘খাইবার’ মিসাইল এবং ‘গুচ্ছ বোমা’ প্রযুক্তির হামলায় ইসরাইল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মার্কিন নৌবাহিনীর গর্ব ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ রণতরীও পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। এই বিশাল সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পর আমেরিকাও এখন নতুন করে বড় কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইছে না, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং জেডি ভ্যান্স যদিও বলছেন যে ইরান চাপে আছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—ইরানের তেলের ৯০ শতাংশ চীন কেনায় তাদের অর্থনীতি সচল রয়েছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোই বেশি চাপে রয়েছে।

উপসংহার: উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এই যুদ্ধবিরতি একটি ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে। তেল খাত হলো এই অঞ্চলের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সচল হওয়া একটি ইতিবাচক সংকেত হলেও, কুয়েতের মতো দেশগুলোর ভাগ্য এখনো হোরমুজ প্রণালীর ওপর ঝুলে আছে । বিশ্ব রাজনীতি এখন ইসলামাবাদের সেই ব্যর্থ আলোচনার রেশ কাটিয়ে নতুন কোনো চুক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, যেখানে কূটনীতিই হবে একমাত্র রক্ষাকবচ ।
প্রতিবেদন: আল জাজিরা ইংলিশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদদাতাদের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *