লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ, ৩৫০ ছাড়িয়েছে প্রাণহানি
লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসযজ্ঞ: ৩৫০ ছাড়িয়েছে প্রাণহানি বৈরুতে ধ্বংসস্তূপের নিচে লাশের মিছিল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। দীর্ঘ সংঘাতের ধারাবাহিকতায় লেবাননের রাজধানী বৈরুতসহ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নজিরবিহীন বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেছে । চার দিন আগে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে লেবাননের ১০০টিরও বেশি স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো ‘ওয়াইডস্কেল’ বা ব্যাপকভিত্তিক এই হামলার ক্ষত এখনো শুকায়নি বরং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় শোক ও আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে ।
১. বৈরুতে ধ্বংসস্তূপের বিভীষিকা ও উদ্ধার অভিযান: লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ‘হায়াসাইলাম’ (Hayasylum) এলাকায় একটি বহুতল ভবন ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে । গত চার দিন ধরে সেখানে উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন । আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনো অনেক মরদেহ বের করে আনা হচ্ছে । নিহতদের সংখ্যা ৩৫০ ছাড়িয়ে গেলেও এই সংখ্যা আরও বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে, কারণ অনেক মরদেহ এখনো নিখোঁজ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে । হাসপাতালগুলোর মর্গে থাকা অনেক মরদেহ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা করা হচ্ছে ।
২. সামরিক রণকৌশল ও বর্তমান পরিস্থিতি: গত বুধবারের সেই ভয়াবহ হামলার পর বৈরুত এবং এর দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলীতে নতুন করে কোনো হামলা হয়নি । তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসরায়েল আক্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে [১]। দক্ষিণ লেবাননে গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বিমান হামলা আরও তীব্র হয়েছে এবং সেখানে কয়েক ডজন হামলায় অসংখ্য বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন । সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি বাহিনী সম্ভবত বৈরুতে হামলা কমিয়ে দক্ষিণ লেবাননে তাদের লক্ষ্যবস্তুগুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে । যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে বৈরুতে হামলা বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি, তবে সংঘাত প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে ।
৩. ওয়াশিংটন বৈঠক ও যুদ্ধবিরতির অমীমাংসিত প্রশ্ন: এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই আগামী মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি প্রথম সরাসরি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে । তবে লেবানন সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, যেকোনো আলোচনার আগে ইসরায়েলকে পূর্ণাঙ্গ ‘যুদ্ধবিরতি’ বা সিজফায়ার ঘোষণা করতে হবে । অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছেন । তার দাবি অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ (Disarmament) করতে হবে এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে ।
৪. হিজবুল্লাহ ও লেবানন সরকারের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন: লেবানন সরকার রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের স্বার্থে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ এবং শান্তি আলোচনার বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখালেও বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল । লেবাননের বর্তমান সরকার রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং দেশটিতে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্যের (Consensus) অভাব রয়েছে । সবচেয়ে বড় বাধা হলো হিজবুল্লাহ নিজেই । গোষ্ঠীটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা কোনোভাবেই অস্ত্র সমর্পণ করবে না এবং ইসরায়েলের সাথে সরাসরি কোনো শান্তি আলোচনায় অংশ নেবে না । এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে যেকোনো সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়ন করা লেবানন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
৫. আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব (ইতিহাসের আলোকে): বর্তমান এই সংঘাত কেবল লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনার তথ্য অনুযায়ী, ইরান এই যুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক হিসেবে কাজ করছে। ইসরায়েল ও আমেরিকার ওপর ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আমেরিকার রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর ওপর আক্রমণের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি এবং ইরানের অর্থনীতির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ছায়া লেবানন সংকটকে এক বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের অংশ হিসেবে ফুটিয়ে তুলছে।
উপসংহার: লেবাননে চলমান এই মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববিবেককে নাড়া দিচ্ছে। একদিকে লাশের স্তূপ আর অন্যদিকে কূটনীতির জটিল চাল—সব মিলিয়ে বৈরুতের আকাশ এখনো অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা । মঙ্গলবারের ওয়াশিংটন বৈঠক কি কোনো সমাধান আনতে পারবে, নাকি নেতানিয়াহুর কঠোর শর্ত আর হিজবুল্লাহর অনড় অবস্থান এই সংঘাতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা ।
প্রতিবেদন: আল জাজিরা ইংলিশ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদদাতাদের তথ্যের ভিত্তিতে।
