হরমুজে ঢুকলেই তলিয়ে যাবে মার্কিন জাহাজ: উত্তেজনা চরমেহরমুজে ঢুকলেই তলিয়ে যাবে মার্কিন জাহাজ: উত্তেজনা চরমে

হরমুজে ঢুকলেই তলিয়ে যাবে মার্কিন জাহাজ: উত্তেজনা চরমে

শান্তির পথ রুদ্ধ: রণক্ষেত্রে ফিরল ইরান ও আমেরিকা; হরমুজ প্রণালী ঘিরে মহাপ্রলয়ের সংকেত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে সাত সপ্তাহ ধরে চলা চরম উত্তেজনা এখন এক ভয়ংকর ও চূড়ান্ত পরিণতির দিকে মোড় নিয়েছে। শান্তির সব আশা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আলোচনার টেবিল থেকে ইরান ও আমেরিকা এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে ফিরে এসেছে । পারস্য উপসাগর এখন এক বিশাল বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সামরিক হুঁশিয়ারি বিশ্বকে এক নতুন ও প্রলয়ঙ্কারী সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে ।

১. ব্যর্থ হলো ২১ ঘণ্টার ইসলামাবাদ বৈঠক কয়েক দশকের কূটনৈতিক অচলায়তন ভাঙতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার এক ম্যারাথন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল । একদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক ঐতিহাসিক সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন । বিশ্ববাসী এই বৈঠক থেকে একটি বড় ‘ব্রেক-থ্রু’ বা যুদ্ধবিরতির আশা করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অনড় অবস্থান এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চরম অবিশ্বাসের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে ।

বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র চিরতরে ত্যাগের চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দিতেই হতো, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি না আসায় আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পরিবর্তে আবারও অবরোধের তিক্ততা ফিরে এসেছে । ভ্যান্সের স্পষ্ট অভিযোগ—ইরান শান্তির বদলে সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে ।

২. হরমুজ প্রণালী ঘিরে ট্রাম্পের ‘নিশ্ছিদ্র দেওয়াল’ ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক রণংদেহী ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন নৌবাহিনী অবিলম্বে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে এক নিশ্ছিদ্র অবরোধ শুরু করবে । ট্রাম্পের ভাষায়, এটি হবে এক ‘নিশ্ছিদ্র দেওয়াল’ যার ভেতর দিয়ে কোনো জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না এবং কোনো জাহাজ সেখান থেকে বেরও হতে পারবে না ।

এই ঘোষণা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে, কারণ হরমুজ প্রণালী হলো বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের হৃৎপিণ্ড। এই অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।

৩. ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি: ‘ভয়ংকর ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যাবে শত্রু’ ট্রাম্পের এই কঠোর হুমকির জবাবে হাত গুটিয়ে বসে নেই তেহরানও। ট্রাম্পের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে [১]। তারা দাবি করেছে যে, হরমুজ প্রণালী বর্তমানে তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে । ইরানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, “কোনো শত্রু যদি এই প্রণালীতে সামান্যতম ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তাদের রণতরীগুলো এক ভয়ঙ্কর ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাবে” । উল্লেখ্য যে, আমাদের পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে জানা গেছে যে, ইরানের ‘খাইবার’ মিসাইল এবং অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ইতিপূর্বেই মার্কিন রণতরীগুলোকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিল।

৪. ‘পাথরের যুগে পাঠিয়ে দেব’: ট্রাম্পের চরম আল্টিমেটাম মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেজাজ এখন সপ্তমে। তিনি ইরানকে এক চরম সময়সীমা বা আল্টিমেটাম বেঁধে দিয়েছেন । ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন যে, ইরান যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে এবং পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ না করে, তবে মাত্র আধা বেলার (১২ ঘণ্টা) মধ্যে তাদের সব ব্রিজ, বাঁধ এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে । ইরানকে বোমাবর্ষণ করে ‘পাথরের যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার এই অমানবিক হুমকি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। এর আগে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী ইরানের বেশ কিছু স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছিল, যা এখন পূর্ণমাত্রার ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগোচ্ছে।

৫. চীনকেও ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এই সংঘাতের আঁচ এখন বেইজিং পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প চীনকেও সতর্ক করেছেন । ট্রাম্পের দাবি, চীনের তৈরি অত্যাধুনিক এন্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল এখন ইরানের হাতে পৌঁছেছে, যা মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য বড় হুমকি । তিনি ঘোষণা করেছেন যে, যদি কোনো দেশ ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করা বন্ধ না করে, তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বা টারিফ বসানো হবে । এটি প্রকারান্তরে চীনের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।

৬. লেবাননে লাশের মিছিল: মানবিক বিপর্যয় এই বড় শক্তিগুলোর দাপট আর যুদ্ধের উন্মাদনার মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ইসরায়েলি বিমান হামলায় লেবানন এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে । প্রতিদিন নিহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং এই সংখ্যা এখন হাজার ছাড়িয়ে গেছে । সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য হলো, নিহতদের মধ্যে একটি বিশাল অংশই হলো নিষ্পাপ শিশু এবং শত শত নারী । ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা অসংখ্য মরদেহ এবং হাসপাতালে আহতদের আর্তনাদ লেবাননকে এক মানবিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রে পরিণত করেছে ।

উপসংহার: ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা সেই ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি এখন মৃতপ্রায়। ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ হুংকার এবং ইরানের পাল্টা মরণপণ লড়াইয়ের শপথ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালী ঘিরেই হয়তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে । বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে শান্তির কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই ।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *