ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ: কোনো চুক্তি ছাড়াই ফিরে যাচ্ছে মার্কিন প্রতিনিধি দল
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার স্নায়ুক্ষয়ী আলোচনা, দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক এবং কয়েক দশকের কূটনৈতিক অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা—সবই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে । মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নিশ্চিত করেছেন যে, কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পেরে তারা যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছেন ।

ম্যারাথন আলোচনা ও জেডি ভ্যান্সের বক্তব্য ইসলামাবাদে মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে এই ম্যারাথন আলোচনা চলে । বৈঠক শেষে জেডি ভ্যান্স গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের সাথে গঠনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারাটা বড় দুঃসংবাদ, বিশেষ করে ইরানের জন্য । তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা আমাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমানাগুলো পরিষ্কার করে দিয়েছিলাম। কোন বিষয়ে আমরা ছাড় দেব আর কোনটিতে দেব না, তাও ইরানের কাছে পরিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু তারা আমাদের শর্তগুলো গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে” ।
পরমাণু ইস্যুতে নতুন মোড় ও অনড় অবস্থান এবারের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র কেবল ইরানের বর্তমান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি । জেডি ভ্যান্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের কাছ থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং দৃঢ় অঙ্গীকার আদায় করা যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা এমন কোনো সরঞ্জাম তৈরির চেষ্টা করবে না যা তাদের দ্রুত পরমাণু শক্তিধর হতে সাহায্য করে ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের এই অবস্থান আলোচনার গতিপথ বদলে দিয়েছে। তারা কেবল পরমাণু কার্যক্রম স্থগিত নয়, বরং চিরস্থায়ীভাবে পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করার প্রতিশ্রুতি চাইছে । ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো ইতিপূর্বেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে ভ্যান্স প্রশ্ন তোলেন, ইরানের কি আসলেই পরমাণু অস্ত্র না তৈরির মানসিকতা বা সদিচ্ছা আছে? এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সদিচ্ছা তাদের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি ।
হরমুজ প্রণালী ও জব্দকৃত সম্পদের জট আলোচনায় অন্য বড় বাধাগুলো ছিল হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ করা ইরানের বিশাল অর্থসম্পদ । ইরান দাবি করেছে যে, কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে তাদের জব্দকৃত সম্পদ অবমুক্ত (Asset unfreeze) করতে হবে । অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের কঠোর অবস্থান থেকে তারা সরতে নারাজ ।
মজার বিষয় হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এখানে কিছুটা অস্পষ্ট। গত ১০ দিনে তিনি দুই ধরণের অবস্থান নিয়েছেন। কখনো বলেছেন হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার কখনো বলেছেন এটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এবং এটি উন্মুক্ত না রাখলে কোনো আলোচনা হবে না । এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং ইরানের অনড় মনোভাব চুক্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে ।
পাকিস্তানের ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা চুক্তি না হলেও এই আলোচনার প্রধান কারিগর হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথম দুই দেশের এত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা সামনাসামনি টেবিলে বসেছেন । জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিল্ড মার্শাল মুনিরের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে পাকিস্তানের কোনো ত্রুটি ছিল না। তারা অবিশ্বাস্য কাজ করেছে এবং দুই দেশের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে” । কূটনীতিবিদদের মতে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের এই সাফল্য ভবিষ্যতের জন্য আলোচনার একটি পথ বা ‘চ্যানেল’ উন্মুক্ত রেখেছে ।
ট্রাম্পের নির্লিপ্ততা ও “আমরা জিতে গেছি” দাবি আলোচনা যখন ইসলামাবাদে চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্লোরিডার মায়ামিতে একটি ইউএফসি (UFC) ম্যাচ উপভোগ করতে দেখা গেছে । আলোচনার সার্বক্ষণিক খবরাখবর তিনি রাখছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে জেডি ভ্যান্স জানান যে তারা প্রেসিডেন্টের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন । তবে ট্রাম্পের একটি মন্তব্য আলোচনার গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি বলেছেন, “চুক্তি হোক বা না হোক, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমরা ইতোমধ্যে যুদ্ধে জিতে গেছি” । ট্রাম্পের এই আত্মতুষ্টি এবং নির্লিপ্ততা নির্দেশ করে যে তিনি সম্ভবত ইরান সংকটকে দ্রুত পেছনে ফেলে আসতে চাইছেন ।
** diplomatদের বিশ্লেষণ: ব্রেকডাউন না কি কেবল বিরতি?** আল জাজিরার প্রতিনিধি ওসামা বিন জাভেদ জানিয়েছেন যে, কূটনীতিকদের মতে এটি পুরোপুরি ‘ব্রেকডাউন’ বা আলোচনা ভেঙে যাওয়া নয়, বরং কোনো ‘ব্রেক-থ্রু’ বা বড় সাফল্য না পাওয়া । যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘বেস্ট অ্যান্ড ফাইনাল অফার’ বা তাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব টেবিলের ওপর রেখে এসেছে । এখন বল ইরানের কোর্টে। ইরান এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে না কি আলোচনার নতুন কোনো মোড় আসবে, তা দেখার জন্য তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অপেক্ষা করতে হবে ।
উপসংহার: ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ২১ ঘণ্টার এই ম্যারাথন বৈঠক শেষে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। একদিকে লেবাননে যুদ্ধবিরতির অভাব এবং অন্যদিকে ইরানের অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে । তবে জেডি ভ্যান্সের রাখা ‘শেষ প্রস্তাব’ এবং পাকিস্তানের সক্রিয় মধ্যস্থতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে কূটনীতির পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়নি । তবে আপাতত কোনো চুক্তি ছাড়াই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দূরত্ব বজায় থাকছে ।
Source: Al Jazeera
