গাজায় যুদ্ধবিরতির মাঝেই ইসরায়েলি বিমান হামলা: সাংবাদিকসহ নিহত আরও ৪, লাশের মিছিল ছাড়ালো ৭৫০
গাজা সিটি ও কায়রো ডেস্ক: গাজায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চললেও থামছে না রক্তক্ষরণ। সোমবার নতুন করে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে । আল জাজিরা ইংলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির সময়কালেই গাজায় নিহতের মোট সংখ্যা এখন ৭৫০ জন ছাড়িয়ে গেছে, যা এই শান্তি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে ।
১. স্কুল ও জনাকীর্ণ স্থানে হামলা: সোমবারে চালানো হামলাগুলোর মধ্যে একটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। সেন্ট্রাল গাজার ডাব্বালা (Dabbala) এলাকায় একটি স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষের ওপর সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েলি ড্রোন । এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন নিহত হন । প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ড্রোন ও ভারি কামানের অবিরাম শব্দে গাজার আকাশ এখন এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে ।
২. কফি শপে হামলা ও সাংবাদিকের মৃত্যু: গাজায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ এবং অনলাইন কর্মীরা চার্জ দেওয়ার সুবিধার জন্য নির্দিষ্ট কিছু কফি শপে ভিড় করেন । তেমনই একটি জনাকীর্ণ কফি শপে রাতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী । হামলায় একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং আরও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন । ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ওই সাংবাদিককে পূর্ববর্তী হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করলেও, তার পরিবার ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন যে তিনি কেবল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করছিলেন এবং হামলার সময় নিজের পেশাগত কাজই সারছিলেন ।
৩. মানবিক সংকট ও যন্ত্রাংশের আকাল: গাজায় কেবল খাবার বা ওষুধের সংকটই নয়, এখন দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র অচল হয়ে পড়ছে । ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় ইলেকট্রনিক্স পণ্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ এবং মোবাইলের পার্টস প্রবেশের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে । এমনকি গাড়ির তেল বা ইঞ্জিন অয়েলও ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, যার ফলে গাজার পরিবহন ব্যবস্থা এবং জরুরি পাওয়ার জেনারেটরগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে । ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের ক্ষেত্রেও সীমান্তে ব্যাপক কড়াকড়ি এবং উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে নিত্যপণ্যের দাম ।
৪. কায়রোতে শান্তি বৈঠক: একদিকে যখন গাজার রাজপথে লাশের মিছিল বাড়ছে, অন্যদিকে মিশরের রাজধানী কায়রোতে শান্তি আলোচনার দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে বৈঠক শুরু হয়েছে । মিশর, তুরস্ক এবং কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা হামাস নেতাদের সাথে গাজা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করছেন । তবে মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনীর একের পর এক ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ সাধারণ মানুষের মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি করেছে ।
৫. আল-শিফা হাসপাতালে লাশের আর্তনাদ: খান ইউনুস এবং উত্তর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক হেলিকপ্টার থেকে চালানো অবিরাম গুলিবর্ষণে আরও অনেক মানুষ আহত হয়েছেন । আহতদের মধ্যে একজনকে আল-শিফা হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি প্রাণ হারান । স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ এখনো চলছে এবং প্রতিটি পদক্ষেপেই ড্রোন হামলার আতঙ্ক কাজ করছে ।
গাজার এই পরিস্থিতি এখন এক অন্তহীন গোলকধাঁধা বা ‘লিম্বো’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তির ছোঁয়া পৌঁছায়নি ।
