ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে পাকিস্তান কেন গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান: শান্তি প্রস্তাব বনাম সংঘাতের চরম উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ বন্ধে এক নাটকীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে পাকিস্তান । আল জাজিরা ইংলিশের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান বর্তমানে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে এবং দেশটির সেনাপ্রধান একটি ‘দ্বি-স্তরীয় শান্তি পরিকল্পনা’ (Two-tiered peace plan) টেবিলে রেখেছেন ।

শান্তি পরিকল্পনার শর্ত ও দুই পক্ষের অনড় অবস্থান: পাকিস্তানের প্রস্তাবিত এই শান্তি পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা বলা হয়েছে তবে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে:
আমেরিকার দাবি: পাকিস্তান মারফত পাঠানো ১৫ দফা দাবিতে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে ইরানকে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ত্যাগ করতে হবে । এছাড়া হরমুজ প্রণালীতে কোনো হামলা না করার নিশ্চয়তা চেয়েছে ওয়াশিংটন ।
ইরানের পাল্টা দাবি: ইরান কোনো সাধারণ যুদ্ধবিরতি চায় না, বরং তারা একটি ‘সমন্বিত চুক্তি’ চায় । তেহরানের দাবি—তাদের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, ভবিষ্যতে আর হামলা হবে না এমন গ্যারান্টি দিতে হবে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে হবে ।
ইসরাইলি হামলা ও ইরানের প্রতিশোধ: শান্তি আলোচনার সমান্তরালে পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি ইসরাইল ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সাউথ পার্স (South Pars) গ্যাস ফিল্ডে হামলা চালিয়েছে, যা ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র । এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় সরাসরি পাল্টা হামলা চালিয়েছে । ইরানের দাবি, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় অর্জন করছে এবং ছয় সপ্তাহ ধরে যুদ্ধ চললেও তারা এখনো তেল আবিবে রকেট হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে ।
মধ্যস্থতায় কেন পাকিস্তান? বিশ্লেষকরা বলছেন, তুরস্ক বা মিশরের মতো দেশগুলোর যোগাযোগ থাকলেও পাকিস্তানের অবস্থান অনন্য। কারণ:
- পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরব ও জিসিসি (GCC) দেশগুলোর গভীর সামরিক সম্পর্ক রয়েছে ।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে পছন্দ করেন, আবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সাথে বেইজিং সফর করে চীনের সমর্থনও আদায় করতে পারেন ।
- ইরানের প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় এবং নিজ দেশে বড় শিয়া ও সুন্নি জনগোষ্ঠী থাকায় ইরানের সাথেও পাকিস্তানের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে ।
আফগানিস্তান সীমান্তে নতুন সংঘাত: ইরান সংকটের মাঝেই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে । পাকিস্তান অভিযোগ করেছে যে, তালেবানরা জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। ফলে ইসলামাবাদ এখন তালেবানদের প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে । একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, তাদের বর্তমান নীতি হলো—“একমাত্র মৃত তালেবানই হলো ভালো তালেবান” । এই সংঘাত নিরসনে চীন, তুরস্ক এবং কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে ।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট: এই বিশাল কূটনৈতিক ও সামরিক তৎপরতার মাঝে পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে জর্জরিত । আইএমএফ (IMF)-এর বেইলআউট এবং আরব আমিরাতের ৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের চাপে আছে দেশটি । যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের দাম গত ছয় সপ্তাহে প্রায় ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে
সারসংক্ষেপে, পাকিস্তান বর্তমানে একটি অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । একদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সংঘাত এবং অন্যদিকে বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতা—এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ ইসলামাবাদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
