হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশকারী বা প্রণালী ত্যাগকারী সব জাহাজ অবরোধ করবে ট্রাম্প
ট্রাম্পের ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ হুঁশিয়ারি: শেষ হতে যাচ্ছে ইরান? ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর যুদ্ধের চরম সংকেত
ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদ ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন চূড়ান্ত যুদ্ধের কালো মেঘে ঢাকা। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা ধরে চলা ঐতিহাসিক ও স্নায়ুক্ষয়ী বৈঠকের পর বিশ্ব যখন শান্তির আশায় ছিল, তখনই এক বিস্ফোরক ঘোষণার মাধ্যমে সেই আশায় জল ঢেলে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একের পর এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের সাথে কোনো সমঝোতা হয়নি এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন ইরানকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত বা ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ অবস্থায় রয়েছে ।
১. ইসলামাবাদ বৈঠক: ২১ ঘণ্টার স্নায়ুযুদ্ধ ও কূটনৈতিক ব্যর্থতা দীর্ঘ কয়েক দশকের অচলায়তন ভেঙে ইসলামাবাদে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে সামনাসামনি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালের পর এই প্রথম দুই দেশের এত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এক টেবিলে বসেন । মার্কিন প্রতিনিধি দলে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার । অন্যদিকে ইরানের পক্ষে ছিলেন মুহাম্মদ বাঘালিবফ, আব্বাস আরাচি এবং আলি বাঘেরি ।
বৈঠকটি টানা ২০ থেকে ২১ ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল এবং অনেক পয়েন্টে ঐকমত্য হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল । এমনকি মার্কিন প্রতিনিধিরা ইরানি প্রতিনিধিদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাদের মধ্যে একটি পেশাদার সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল । কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র ইস্যুতে সব আলোচনা ভেস্তে যায়—তা হলো ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা । ট্রাম্পের মতে, পরমাণু শক্তি এমন এক ‘অস্থির ও অনির্দেশ্য’ নেতৃত্বের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না ।
২. ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’: যুদ্ধের নতুন হুমকি বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পরপরই ট্রাম্প তার পোস্টে ঘোষণা করেন যে, ইরানের হাতে সময় শেষ হয়ে আসছে। তিনি লিখেছেন, “আমরা এখন পুরোপুরি লকড অ্যান্ড লোডেড এবং আমাদের সামরিক বাহিনী ইরানের যা কিছু অবশিষ্ট আছে তা শেষ করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করবে”। এই ঘোষণাটি বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে কারণ এর অর্থ হলো, মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, যা আলোচনার জন্য সাময়িকভাবে স্থগিত ছিল, তা এখন যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণ শক্তিতে পুনরায় শুরু হতে পারে ।
৩. হোরমুজ প্রণালী: বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু এখন পারমাণবিক ইস্যু থেকে সরে এসে হোরমুজ প্রণালীর ওপর গিয়ে ঠেকেছে । ট্রাম্প ইরানের ওপর অভিযোগ তুলেছেন যে, তারা এই আন্তর্জাতিক জলপথটি বন্ধ করে বিশ্বজুড়ে মানুষের কষ্ট ও অস্থিরতা বাড়াচ্ছে । ইরান দাবি করেছে যে তারা পানিতে মাইন বিছিয়ে রেখেছে, যদিও ট্রাম্পের দাবি—ইরানি নৌবাহিনীর অধিকাংশ অংশ এবং মাইন সরানোর সরঞ্জামগুলো আগেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে ।
ট্রাম্প সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ইরানকে এই ‘আন্তর্জাতিক জলপথ’ খুব দ্রুত এবং জরুরি ভিত্তিতে খুলে দিতে হবে । তিনি একে ইরানের পক্ষ থেকে একটি ‘অবৈধ চাঁদাবাজি’ (Extortion) হিসেবে অভিহিত করেছেন । ট্রাম্পের এই কড়া বার্তার ফলে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা এবং জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ।
৪. ইরানের অনড় অবস্থান ও ধর্মীয় ডিক্রি তেহরান থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ইরানি আলোচকরা অত্যন্ত কঠিন এবং আপোষহীন অবস্থানে রয়েছেন । তাদের কাছে হোরমুজ প্রণালী এখন একটি বড় সম্পদ বা ‘অ্যাসেট’ হিসেবে কাজ করছে, যা তারা সহজে ছাড়তে নারাজ । ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার এই জলপথ বন্ধ রাখাকে কেবল একটি সরকারি আদেশ নয়, বরং একটি ‘ধর্মীয় ডিক্রি’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ।
ইরানের দাবি হলো, হোরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার আগে তাদের দুটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হবে:
লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হবে ।
যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ করা ইরানের অর্থসম্পদ বা অ্যাসেট অবমুক্ত (Unfreeze) করতে হবে [৯]।
এই শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানি আলোচকদের মতে, এই আলোচনা ছিল যুদ্ধের মাঝে একটি বিরতি মাত্র, যুদ্ধের শেষ নয় [৯]।
৫. পাকিস্তানের ভূমিকা ও মানবিক বিপর্যয় এড়ানোর প্রশংসা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও পাকিস্তান এক অসাধারণ কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছে। ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ-এর নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প । ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে হতে যাওয়া একটি ভয়াবহ যুদ্ধ থামিয়ে তিনি ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন, যার জন্য পাকিস্তানি নেতারা তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন । এই কৃতজ্ঞতা ও সফল মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান বিশ্ব রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করলেও ইরান-মার্কিন সংঘাত নিরসনে তাদের সেই ‘আশার আলো’ এখন ফিকে হয়ে আসছে ।
৬. অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার পোস্টে ইরানের নেতাদের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননা প্রকাশ করে বলেছেন যে, তাদের সম্মান ও মর্যাদা শেষ হয়ে গেছে । ট্রাম্পের মূল বার্তাটি অত্যন্ত পরিষ্কার—ইরানকে হয় নিঃশর্তভাবে পিছু হটতে হবে, নয়তো মার্কিন সামরিক বাহিনীর চূড়ান্ত ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হবে ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন বিশ্ব রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি হোরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়া না হয়, তবে আমেরিকা তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে সেখানে অবরোধ বা সরাসরি হামলা চালাতে পারে [৪]। ইরানের ‘অappropriate moment’ বা উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য মার্কিন বাহিনী অপেক্ষা করছে বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন ।
উপসংহার: ইসলামাবাদে ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে এখন কেবল একটি শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—যুদ্ধ। কূটনীতির সব দরজায় এখন তালা ঝুলে গেছে বলে মনে হচ্ছে । ইরান যদি তাদের পরমাণু জেদ এবং হোরমুজ প্রণালীর অবরোধ বজায় রাখে, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক সর্বগ্রাসী আগুনের মুখে পড়তে যাচ্ছে, যার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ ।