ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ: নীরবে কেড়ে নিচ্ছে যৌনস্বাস্থ্য, লজ্জায় চিকিৎসা নিচ্ছেন না অনেকে
ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশনে আক্রান্তদের যৌন সমস্যা নিয়ে সচেতনতা জরুরি; সময়মতো চিকিৎসায় সমাধান সম্ভব
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হৃদরোগ, কিডনি বা চোখের জটিলতা নিয়ে আলোচনা হলেও এই দুই রোগের আরেকটি প্রভাব নিয়ে প্রায় কেউ কথা বলেন না, তা হলো যৌনস্বাস্থ্য। চিকিৎসকেরা বলছেন, লজ্জা ও সামাজিক সংকোচের কারণে বহু রোগী এই সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান না। অথচ সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে অনেক ক্ষেত্রেই উন্নতি সম্ভব।
উত্তর: হ্যাঁ, প্রভাব ফেলে
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ উভয়ই পুরুষ ও নারীর যৌনক্ষমতা ও যৌন আগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মূল কারণ রক্তনালি ও স্নায়ুর ক্ষতি। যৌন উদ্দীপনা ও সাড়া প্রধানত রক্তপ্রবাহ, স্নায়ুর সংকেত ও হরমোনের ওপর নির্ভর করে, আর এই তিনটিই এই দুই রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডায়াবেটিস কীভাবে প্রভাব ফেলে
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে ছোট রক্তনালি ও স্নায়ু ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে:
- পুরুষদের ক্ষেত্রে: উত্থান-জনিত সমস্যা (ইরেক্টাইল ডিসফাংশন) সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে এই সমস্যা অন্যদের তুলনায় বেশি এবং তুলনামূলক কম বয়সেই শুরু হতে পারে। এ ছাড়া টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যৌন আগ্রহ কমতে পারে, কখনো বীর্যপাতজনিত জটিলতাও দেখা দেয়।
- নারীদের ক্ষেত্রে: যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, যোনিপথে শুষ্কতা, মিলনে ব্যথা, চরম পুলক পেতে অসুবিধা এবং বারবার ছত্রাক বা মূত্রনালির সংক্রমণ হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ কীভাবে প্রভাব ফেলে
দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে রক্তনালির দেয়াল শক্ত ও সংকীর্ণ হয়ে যায়। এতে যৌনাঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে পারে না।
- পুরুষদের উত্থান ধরে রাখতে সমস্যা হতে পারে।
- নারীদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গে রক্তপ্রবাহ কমে উদ্দীপনা ও আর্দ্রতা কমতে পারে।
- কিছু রক্তচাপের ওষুধও (যেমন কিছু বিটা-ব্লকার ও মূত্রবর্ধক) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে যৌন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এমন হয় না।
মানসিক চাপও একটি কারণ
দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ে দুশ্চিন্তা, অবসাদ, ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা যৌন আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। আবার যৌন সমস্যা দেখা দিলে তা থেকে আত্মবিশ্বাসের অভাব ও দাম্পত্য টানাপোড়েন তৈরি হয়, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে।
সতর্কসংকেত হিসেবেও দেখা যেতে পারে
চিকিৎসকদের মতে, উত্থান-জনিত সমস্যা অনেক সময় হৃদরোগ বা রক্তনালির রোগের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে। তাই যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে এবং হঠাৎ এ ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাদের উচিত বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
প্রতিকার ও প্রতিরোধের উপায়
- নিয়ন্ত্রণে রাখুন: রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ চিকিৎসকের নির্ধারিত মাত্রার মধ্যে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
- নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম রক্তসঞ্চালন ও হরমোনের ভারসাম্য উন্নত করে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সুষম খাদ্য: অতিরিক্ত ওজন দুই রোগকেই বাড়ায় এবং যৌনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
- ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন: ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি বাড়ায়, ফলে সমস্যা আরও খারাপ হয়।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন: প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া যেতে পারে।
- সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা: এতে মানসিক চাপ কমে এবং সম্পর্ক দৃঢ় থাকে।
যা করবেন না
- নিজে নিজে ওষুধ খাবেন না। বাজারে বিক্রি হওয়া উত্থানবর্ধক ওষুধ বা “শক্তিবর্ধক” ট্যাবলেট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে হৃদরোগের রোগীদের জন্য। কিছু ওষুধ হৃদরোগের নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে মিলে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
- রক্তচাপের ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করবেন না। ওষুধের কারণে সমস্যা মনে হলে চিকিৎসককে জানান; তিনি ওষুধ বদলে দিতে পারেন।
- হাতুড়ে ও বিজ্ঞাপননির্ভর চিকিৎসা এড়িয়ে চলুন।
চিকিৎসকের কাছে কখন যাবেন
উত্থান বা যৌন আগ্রহে পরিবর্তন কয়েক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে অথবা নারীদের ক্ষেত্রে ব্যথা, শুষ্কতা বা বারবার সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, ইউরোলজিস্ট বা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনে সহায়তা করতে পারেন। কারণ নির্ণয়ের পর ওষুধ, হরমোন চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনসহ একাধিক কার্যকর পথ আছে।
শেষ কথা
যৌনস্বাস্থ্য সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অংশ। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এ বিষয়ে লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা। রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অনেকেই সুস্থ ও স্বাভাবিক যৌনজীবন বজায় রাখতে পারেন।