পুরুষের যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার কারণ কী? জেনে নিন লক্ষণ, করণীয় ও চিকিৎসা
পুরুষের যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া একটি পরিচিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা। অনেক পুরুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এ ধরনের পরিবর্তন অনুভব করতে পারেন। কারও ক্ষেত্রে সাময়িক মানসিক চাপ বা ঘুমের অভাব এর কারণ হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের প্রভাব জড়িত থাকতে পারে।
এ নিয়ে অনেকে অস্বস্তি বা লজ্জার কারণে কারও সঙ্গে কথা বলতে চান না। অথচ যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া মানেই পুরুষত্ব হারিয়ে ফেলা নয়। সমস্যাটি কেন হচ্ছে, কত দিন ধরে চলছে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না, তা বোঝা জরুরি।
পুরুষের যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া বলতে কী বোঝায়?
যৌন ইচ্ছা বা যৌন আকাঙ্ক্ষাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় লিবিডো (Libido) বলা হয়। এটি ব্যক্তিভেদে আলাদা এবং বয়স, শারীরিক অবস্থা, মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে পারে।
কোনো পুরুষের আগের তুলনায় যৌন আগ্রহ কমে গেলে, যৌন চিন্তা বা আকাঙ্ক্ষা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেলে কিংবা এ পরিবর্তন নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তবে সবার যৌন ইচ্ছা সমান হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। শুধু যৌনমিলনের সংখ্যা কম হলেই রোগ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পুরুষের যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার ৮টি সম্ভাব্য কারণ
১. মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা
কাজের চাপ, আর্থিক সমস্যা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা যৌন ইচ্ছায় প্রভাব ফেলতে পারে। মন যখন দীর্ঘ সময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে, তখন ঘনিষ্ঠতার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
যৌন সক্ষমতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাও সমস্যা বাড়াতে পারে। একবার কোনো অসুবিধা হলে পরেরবার একই ঘটনা ঘটবে—এমন আশঙ্কা থেকে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
২. ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত ক্লান্তি
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে মেজাজ, শক্তি, মনোযোগ এবং যৌন আগ্রহে পরিবর্তন আসতে পারে।
যাঁরা রাতে দীর্ঘ সময় কাজ করেন বা অনিয়মিত সময়ে ঘুমান, তাঁদের ক্ষেত্রে ঘুমের রুটিন ঠিক করা উপকারী হতে পারে। জোরে নাক ডাকা ও ঘুমের মধ্যে শ্বাস আটকে আসার মতো সমস্যা থাকলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার।
৩. টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া
টেস্টোস্টেরন পুরুষের যৌনস্বাস্থ্য ও প্রজনন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই হরমোনের মাত্রা কমে গেলে যৌন ইচ্ছা হ্রাস, ক্লান্তি, পেশিশক্তি কমে যাওয়া বা মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার অর্থই টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া নয়। উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনে সকালে রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত রোগ নির্ণয়ের জন্য আলাদা দিনে একাধিকবার কম মাত্রা নিশ্চিত করার প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ
ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, স্থূলতা এবং থাইরয়েডের সমস্যার সঙ্গে যৌনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক থাকতে পারে। এসব রোগ শরীরের শক্তি, রক্তনালির কার্যক্রম, হরমোন ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডায়াবেটিসে স্নায়ু ও রক্তনালির ক্ষতি হলে লিঙ্গ উত্থানজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া এবং লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা এক বিষয় নয়; দুটি একসঙ্গেও হতে পারে, আবার আলাদাভাবেও হতে পারে।
৫. বিষণ্নতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা
বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এতে আগের পছন্দের কাজেও আগ্রহ কমে যেতে পারে, ঘুম ও ক্ষুধার পরিবর্তন হতে পারে এবং যৌন আকাঙ্ক্ষাও হ্রাস পেতে পারে।
দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, কোনো কিছুতে আনন্দ না পাওয়া বা দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারানোর মতো লক্ষণ থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উপকারী।
৬. নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু বিষণ্নতার ওষুধ, নির্দিষ্ট রক্তচাপের ওষুধ, ওপিওয়েডজাত ব্যথানাশক এবং কিছু হরমোন-সম্পর্কিত চিকিৎসা যৌন ইচ্ছা বা যৌন কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।
কোনো ওষুধ শুরু করার পর থেকে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসককে বিষয়টি জানান। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প চিকিৎসা বিবেচনা করা সম্ভব।
৭. দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন
সঙ্গীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি, আবেগগত দূরত্ব, আস্থার অভাব বা দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দিতে পারে। কখনো যৌনমিলন নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা বা পারফরম্যান্সের চাপও এর পেছনে কাজ করে।
এ ক্ষেত্রে দোষারোপ না করে শান্তভাবে কথা বলা, পরস্পরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনে দম্পতি কাউন্সেলিং নেওয়া সহায়ক হতে পারে।
৮. ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও জীবনযাপনের অনিয়ম
ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি যৌনস্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান ত্যাগ শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে এসব পরিবর্তন করলেই প্রত্যেকের যৌন ইচ্ছা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
যৌন ইচ্ছা কমে গেলে কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
ব্যক্তিভেদে লক্ষণ আলাদা হতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- আগের তুলনায় যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া।
- যৌন চিন্তা বা ঘনিষ্ঠতার প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাওয়া।
- যৌন ইচ্ছার পরিবর্তন নিয়ে মানসিক অস্বস্তি তৈরি হওয়া।
- একই সঙ্গে ক্লান্তি, মন খারাপ বা ঘুমের সমস্যা থাকা।
- কিছু ক্ষেত্রে লিঙ্গ উত্থান বা যৌন কার্যক্রমে অসুবিধা দেখা দেওয়া।
এসব লক্ষণ থাকলেই নির্দিষ্ট কোনো রোগ হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। কারণ নির্ধারণের জন্য ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও উপসর্গ মূল্যায়ন করা জরুরি।
পুরুষের যৌন ইচ্ছা বাড়াতে কী করা যেতে পারে?
যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার কারণ অনুযায়ী করণীয় নির্ধারণ করা উচিত। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
নিয়মিত ঘুমান: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের চেষ্টা করুন।
শরীরচর্চা করুন: নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটা বা অন্যান্য ব্যায়াম করুন।
সুষম খাবার খান: শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন।
মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন: বিশ্রাম, শখের কাজ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং সহায়ক হতে পারে।
সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলুন: যৌন সমস্যা নিয়ে লজ্জা বা দোষারোপ না করে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তুলুন।
দীর্ঘস্থায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন: ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কোনো অসুস্থতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিন।
যৌন ইচ্ছা বাড়ানোর ওষুধ কি খাওয়া উচিত?
বাজারে যৌনশক্তি বাড়ানোর নামে বিভিন্ন ট্যাবলেট, সিরাপ, হারবাল পণ্য ও সাপ্লিমেন্ট বিক্রি হয়। কিন্তু এসব পণ্যের সবগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। কিছু পণ্যে অঘোষিত ওষুধ বা ক্ষতিকর উপাদানও থাকতে পারে।
টেস্টোস্টেরন চিকিৎসা কেবল উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হয়। প্রয়োজন ছাড়া টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে শুক্রাণু উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং সন্তান নেওয়ার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
একইভাবে, লিঙ্গ উত্থানের ওষুধ যৌন ইচ্ছা বাড়ানোর ওষুধের সমতুল্য নয়। নিজের সমস্যার কারণ না জেনে কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যৌন ইচ্ছা দীর্ঘদিন ধরে কম থাকলে, বিষয়টি মানসিক কষ্ট বা সম্পর্কের সমস্যার কারণ হলে কিংবা সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ওজন পরিবর্তন, যৌন কার্যক্রমে অসুবিধা বা বিষণ্নতার লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রয়োজনে চিকিৎসক রোগের ইতিহাস, ব্যবহৃত ওষুধ এবং শারীরিক লক্ষণ মূল্যায়ন করে রক্তে শর্করা, থাইরয়েড বা টেস্টোস্টেরন পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। সবার সব পরীক্ষা দরকার হয় না।
শেষ কথা
পুরুষের যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কখনো এটি সাময়িক পরিবর্তন, আবার কখনো শারীরিক বা মানসিক কোনো সমস্যার লক্ষণ। তাই নিজেকে দোষারোপ করা বা গোপনে যৌনশক্তির ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সঠিক মূল্যায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই উপসর্গের উন্নতি সম্ভব। যৌনস্বাস্থ্যও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি অংশ—এ নিয়ে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যসূত্র: NHS, Mayo Clinic এবং Endocrine Society-এর যৌনস্বাস্থ্য, ইরেকটাইল ডিসফাংশন ও পুরুষের হরমোন-সংক্রান্ত নির্দেশনা।
দ্রষ্টব্য: এই আর্টিকেলটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।